১৪ দিনে ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে ৮০ টাকা

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ | ৭:৩১ পূর্বাহ্ণ
জাতীয় ডেক্স

সরকারি তথ্যমতে, ব্রয়লার মুরগির মাংস পুষ্টিগুণ এবং সস্তা হওয়ায় শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষ সহজলভ্য এই মাংস থেকে আমিষের চাহিদা মেটান। ফলে কম দামের ব্রয়লার মুরগি কেনেন তারা। এখন আর সেই সুযোগ থাকছে না। বছরের শুরুতে ১৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া ব্রয়লার মুরগি ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে ২০০ টাকা পৌঁছায়। কয়েকদিনের ব্যবধানে তা ২২০ টাকা হয়ে যায়। গতকাল বুধবার আর ১০ টাকা বেড়ে ২৩০ টাকায় অবস্থান নিয়েছে। সাধারণ মানুষ একে ব্যবসায়ীদের কারসাজি বললেও খুচরা ব্যবসায়ীরা খামারিদের ওপর দায় চাপাচ্ছেন। খামারিরা পোলট্রি সরবরাহকারী বড় ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া বাজার ব্যবস্থার কারণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মুরগির খাদ্য, বাচ্চার দাম ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাড়াকে দায়ী করছেন। খামারিরা মনে করেন, করপোরেট কোম্পানিকে মুরগি ও ডিম উৎপাদন বন্ধ করে শুধু সরবরাহ করলে বাজারে ফার্মের ডিম ও মুরগির দাম কমে আসবে। পাশাপাশি প্রান্তিক খামারিরা ঝুঁকিমুক্ত ব্যবসা করতে পারবেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জানুয়ারি মাসজুড়ে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে ছিল ব্রয়লার মুরগির দাম। ফেব্রুয়ারি মাসের গত ১৪ দিনে দাম বৃদ্ধি পেয়ে এখন ২৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি ফার্মের লাল ডিমের দাম এক মাসের ব্যবধানে হালিতে ৯ টাকা বেড়ে ৪৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। জানুয়ারি মাসে যে বাচ্চার দাম ছিল ৪৩ টাকা, তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৫৬ টাকায়। অন্যদিকে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ৫০ কেজির এক বস্তা ব্রয়লার মুরগির খাদ্যের দাম ছিল ২ হাজার ৮৫০ টাকা, যা এখন বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৬০০ টাকা বা এলাকাভেদে তারও বেশি দামে।
মূলত ফেব্রুয়ারি মাসে গ্যাস ও বিদ্যুতের নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর থেকে দেশের সব খাতেই ব্যবসায়ীরা নিজেদের সিদ্ধান্তে দাম বাড়াতে শুরু করেছেন। এর জন্য সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন না। অনেকে আবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দায়সারা একটি চিঠি পাঠিয়ে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের অযৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। যদিও ইতোমধ্যে নিত্যপণ্যের সবগুলোর দাম কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা করে বেড়েছে। আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে পণ্যের দাম ১০০ ভাগের বেশি বেড়েছে। ডিম ও মুরগির দাম বাড়ার কারণ হিসেবে রাজধানীর নিউমার্কেট কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী শাহ আলম কালবেলাকে বলেন, খামারে দাম বেড়েছে। তবে এর আগে কখনো এভাবে দাম বাড়েনি। মাত্র ১৫ দিনে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে বিনিয়োগ বাড়াতে হচ্ছে। আবার অনেক সময় মুরগি মারা গেলে লোকসানও হচ্ছে।
সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের ক্রেতা নূরুল আমিন কালবেলাকে বলেন, জানুয়ারি মাসে ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল ১৩০ থেকে ১৪৫ টাকা, আর আজ (গতকাল) কিনলাম ২৩০ টাকায়। এভাবে গরিবের খাবারের দাম বাড়তে থাকলে না খেয়ে থাকতে হবে। বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) সভাপতি সুমন হাওলাদার কালবেলাকে বলেন, প্রান্তিক খামারিরা এখন কেজি ১৬০ টাকায় বিক্রি করছেন, কিন্তু সরবরাহ চেইনে যারা যুক্ত, তাদের কারণে দামটা ২০০ টাকার বেশি উঠেছে। প্রান্তিক খামারিরা ৫০ কেজির এক বস্তা মুরগির খাদ্য ৩ হাজার ৬০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে, যা বহুজাতিক কোম্পানির চুক্তিভিত্তিক খামারিরা পাচ্ছেন ২ হাজার ৫০০ টাকায়। অন্যদিকে, সাধারণ খামারিরা প্রতি পিস বাচ্চা কিনতে হচ্ছে ৬০ টাকায়। কিন্তু তারা নিজেদের কোম্পানি, নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় মুরগির বাচ্চা, ডিম, খাদ্য ও ওষুধের খরচ কম থাকায় বেশি লাভে বিক্রি করছেন। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট কোম্পানি থেকে বেশি দামে বাচ্চা, ডিম, খাদ্য এবং ওষুধ বেশি দামে কিনতে হচ্ছে সাধারণ খামারিদের। যেজন্য ব্যয় বেশি, লাভ কম হচ্ছে। তিনি বলেন, দাম বেশি থাকার কারণে বর্তমানে প্রতিদিন ১ কোটি ৮০ লাখ বাচ্চা উৎপাদন হচ্ছে, দাম কমলে বহুজাতিক কোম্পানির মালিকরা বাচ্চার উৎপাদন কমিয়ে ৫০ লাখে নিয়ে আসেন। নিজেদের চুক্তিভিত্তিক খামারে বাচ্চা সরবরাহ করেন। যারা চুক্তির খামারে যাচ্ছেন, তারা সাময়িক লাভবান হচ্ছেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি তারা পর্যায়ক্রমে জিম্মি হয়ে যাচ্ছেন। পোলট্রি খামারিরা দাবি করছেন, করপোরেট প্রতিষ্ঠান শুধু বাচ্চা ও খাদ্য সরবরাহ করলে বাজারে মুরগির দাম কমে আসবে। এ ছাড়া বাজার কোনোভাবে স্বাভাবিক হবে না। কারণ, তারা নিজেরাই সব নিয়ন্ত্রণ করছে এবং প্রান্তিক খামারিরা প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বাধ্য হয়ে চুক্তিভিত্তিক খামার করতে হচ্ছে বা বন্ধ করে দিচ্ছেন। কৃষি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রি সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) তথ্যমতে, মোট পোলট্রি শিল্পের ৪০ ভাগ ব্রয়লার বা মাংস উৎপাদনকারী মুরগি। বাংলাদেশে মাথাপিছু মুরগির মাংস খাওয়ার পরিমাণ মাত্র ২৭ কেজি। মুরগির মাংসে আছে অ্যামাইনো এসিড, ভিটামিন-মিনারেল, যা শরীর গঠন, মেধা বৃদ্ধি ও শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা।